শিক্ষাব্যবস্থা হতাশা বাড়াচ্ছে

কিভাবে শিক্ষাব্যবস্থা হতাশা বাড়াচ্ছে এবং কেন নিজেকে অন্যদের থেকে ছোট মনে হয়

আজকে আমরা আমাদের বাস্তব জীবনের কিছু শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলব। অনেক বছর আগে যখন প্রাণীদের সাঁতারু * আরানদাজ, দৌড়বাজ, এসবের কিস্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে ভাগ করা হচ্ছিল। তখন জঙ্গলে একটা স্কুল তৈরি হয়, এই সমস্ত প্রাণীদের আরও উন্নত করে তোলার জন্য। এই স্কুলের মত অনুযায়ী সেই প্রাণীটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে হবে। যে প্রাণীটি কোন একটা জিনিস ১নং না হয়ে বরং সবকটা জিনিসে একসাথে পারদর্শী হতে হবেন। আর যদি কোন প্রাণী কোন একটা জিনিসে পারদর্শী হয়, কিন্তু বাকি কাজগুলোতে পারদর্শী কম হয়, তাহলে তার সমস্ত সময় পরিশ্রম বাকি কাজগুলোতে পারদর্শী হয়ে ওঠার জন্য ব্যয় করা হবে।

যদি কারো পা ছোট কিন্তু পাকনা বড় হয়, তবে খেয়াল এদিকে দেওয়া হবে যে, কিভাবে তাকে দৌড়ানোর উন্নতি করানো যায়। যাতে করে সে সমস্ত দিকে সমান ভাবে পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে। রাজহাঁসকে সাঁতার কাটার বদলে বলা হলো দৌড়ানো শিখতে আর পেঙ্গুইন উড়ানো শিখতে জোর দেওয়া হলো এবং ঈগল কেও বলা হলো দৌড়ানো শেখার জন্য নির্মমভাবে জোরজবরদস্তি শুরু করা হলো। ঈগল কে শুধুমাত্র নিজের শখের জন্য উড়ার অনুমতি ছিল।

সবথেকে বাজে অবস্থা ছিল ব্যাঙের। কারণ ওরা তো ঠিক মতো দৌড়াতে পারতো না আর হাটতেও পারতো না। এই সমস্ত অত্যাচার চলছিল শিক্ষাব্যবস্থার উপর। সবাই সরকারের তরফ থেকে গিফট গুলো পেয়েছিল সেগুলোর উপর কারোর ভরসা ছিল না। সবাই মানতো যে প্রত্যেকে ইন্ডিভিজুয়াল এবং সবাই যখন সবকিছুতে সমানভাবে দক্ষ হয়ে উঠবেন। সমাজের উন্নতি তখনই হবে যখন সবাই সবকিছুতে সমানভাবে পারদর্শী হয়ে কাজ করতে পারবে। কিছু প্রাণী যারা এই শিক্ষাব্যবস্থাকে অস্বীকার করেছে, তাদেরকে বড় শাস্তি দেওয়া হতো। মাদারনেসার তাদের যে গিফট দিয়েছে সেগুলোর প্রতি আরো বেশি মনোযোগ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাদেরকেই অক্ষতভাবে অপমানিত করা হতো। সবাই তাদের পাগল মাথামোটা বলে হাসাহাসি করতো। আর যখনই তারা সেই শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীতে গিয়ে ভালো কিছু করে দেখানোর চেষ্টা করত, তখন তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাদেরকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হতো।

Advertisement
কিভাবে শিক্ষাব্যবস্থা হতাশা বাড়াচ্ছে
কিভাবে শিক্ষাব্যবস্থা হতাশা বাড়াচ্ছে

এই স্কুল থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত পাশ করে বের হতে পারত না, যতক্ষণ অব্দি কেউ প্রতিটা জিনিসের পারদর্শী হয়ে না উঠে। হঠাৎ গাছে চড়া, সাঁতার, দৌড় এবং হাটা চলা করা সবকিছুতে দক্ষ হতে হবে। এই কারণে রাজহাঁস সাতার কাটা একেবারে কমিয়ে দিয়ে দৌড়ানোর চেষ্টায় রয়েছে। এটা সাঁতার কাটা এতটাই কমিয়ে দিল রাজহাঁস কিভাবে সাঁতার কাটতে হয় তা ভুলে যেতে লাগলো। আর সাথে সাথে প্রতিদিন ওর কপালে বকাবকি যুদ্ধ শুরু হলো। সবাই একে এলো চোখে দেখতে শুরু করলো। এতে রাজহাঁসের কাছে ওর জীবনটা একটা বোঝার মত হয়ে উঠতে শুরু করল। আর এভাবে চলতে থাকায় একটা সময় রাজহাঁসকে অপমানিত করে সেই স্কুল থেকে বার করে দেওয়া হল।

কারণ তখন আর পাতি হাস দুটোতেই বেশি পারদর্শী হয়ে উঠেছিল। এজন্য রাজহাঁসের পরিবর্তে পাতিহাঁস দুটো বিষয়ে পুরস্কার পেল। অন্যদিকে হাজার চেষ্টা করেও কিছুতেই নিজের পা দিয়ে ছুড়ে ঈগল গাছের মাথায় উঠতে পারছিল না। যদিও এটা দেখান সে উড়াল দিয়ে খুব সহজেই সেই গাছের মাথায় নিমিষে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু তার এই কাজটাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিচার করা হলো। কারণ সে নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছিল।

একটা বিকলঙ্গ ব্যাঙ মাছ প্রমাণ করে দিল সে একইসাথে দৌড়ানো, সাঁতার কাটা, গাছে চড়া, এবং অল্প অল্প উড়তেও পারদর্শী। এজন্য তাকে স্কুলে সর্বশ্রেষ্ঠ ছাত্র হিসেবে স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ এর পুরস্কার দেওয়া হল। এই অসাধারণ প্রবন্ধটি এইসব ছদ্মনাম এর অধীনে ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর থেকে কয়েকশো বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজ এই প্রবন্ধটি একদম পারফেক্ট ভাবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বর্ণনা করে। এবং এটা বুঝতে সাহায্য করে যে কেন আজব পৃথিবী জুড়ে এত মানুষ ইনফেরিয়রিটি কম্প্লেক্স নিজেকে অন্যের থেকে কম মনে করে সারাজীবন হতাশায় ভোগে।

Advertisement

ইনফেরিয়রিটি কম্প্লেক্স শব্দটি সর্বপ্রথম আলফার্ড এডলার সর্বপ্রথম ব্যবহার করেছিলেন। এর মানে হল, সবসময় নিজেকে অন্যদের থেকে কম মনে করা। আজ থেকে ৫০ কি’বা ১০০ বছর আগে সারা দিনে আপনারও শুধুমাত্র আশেপাশে অল্প কয়েকজন প্রতিবেশীদের সাথে কথাবার্তা হতে পারতো। এরাও অনেক দিক থেকেই আপনার মতই ছিল। আর কিছু বিখ্যাত লোকেদের ব্যাপারে হয়তো আপনি অল্প স্বল্প খবর পেতেন। এই টুকুই কিন্তু আজকের পৃথিবীটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আজ আমরা চাইলে হাজারো লোকের সোশ্যাল মিডিয়ায় একাউন্টে গিয়ে চুপচাপ তাদের স্ট্যাটাস আপডেট গুলো দেখে আর জীবনে কি চলছে সে সম্পর্কে খুব সহজেই ইচ্ছা করলেই জানতে পারি।

এতজনের আনন্দের মুহূর্তে ভরা একের পর এক পোস্ট দেখার পর এটা মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। এই পৃথিবীতে একমাত্র আপনি হয়তো খারাপ আছেন। বাকি সবাই মজায় জীবন কাটাচ্ছে। ভিতরে ভিতরে কোথাও আপনি জানেন যে, সেটা সত্যি না কিন্তু তাও নিজের চোখকে কি করে অবিশ্বাস করবেন বলুন!😢 আপনার বন্ধুরা মিলে হয়তো কোথাও ঘুরতে গিয়ে একসাথে ছবি তুলে পোস্ট করছে আর ছবিগুলো ঠিক তেমনভাবে তোলা যেন দেখে মনে হচ্ছে কত আনন্দ করেছে। সেদিন এদের একে অপরের সাথে কত ভালো বন্ডিং। আর যখন আপনি সিঙ্গেল তখন আপনার কোন বন্ধু যদি তার গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ডের সেলফি তুলে পোস্ট করে সেটা দেখার পর দিয়ে বুকে কি ব্যথা করে ওঠে। সেটা সিঙ্গেলস তারাই একমাত্র জানে সেলফিতে সেই দুজনের আউটলুক বন্ডিং সবকিছু একদম পারফেক্ট বলে মনে হয়। তার ওপর আবার সেই পোস্টগুলোতে কয়েকশো লাইকস।

এই জীবন-সমস্যার সমাধান কি?

যদি আমরা অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করা বন্ধ করি, নিজের লাইফের প্রতি এক্সপেক্টেশন বাড়িয়ে তোলার বাজে অভ্যাস তাকে ছাড়তে পারি এবং এটা বুঝে যায় যে, সবাই ওনাদের নিজের লাইফ এর ব্যাপারে যা যা হাইলাইট করে দেখায়। সেগুলো হেভি এডিটেড থাকে, তাহলে আমরা নিজেদেরকে এর থেকে বাইরে নিয়ে আসতে পারবো। লোকে আপনার ব্যাপারে কি ভাবে এবং নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করা এই দুটো বাজে অভ্যাস যদি আপনি সম্পূর্ণ ত্যাগ করে ফেলতে পারেন। তো আপনি ইনফেরিয়রিটি কম্প্লেক্স জিনিসটাকে একদম গোড়া থেকে নির্মূল করতে পারবেন। অনেক সময় অন্য কারোর কথা সত্যি বলে মেনে নিয়ে আমরা নিজেদেরকে অন্যদের থেকে কম বলে মনে করতে শুরু করি। কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমরা আমাদের নিজেদের চিন্তাভাবনার কারণেই নিজেকে অন্যদের থেকে কম বলে ভাবতে শুরু করি। আপনি দেখতে কতটা সুন্দর, কতটা লম্বা, কতটা ধনী, কতজন মানুষ আপনাকে ভালোবাসে এই সমস্ত লম্বা হতে ধনী-গরিব সুন্দর এই সবকিছুই একমাত্র অন্যের সাথে নিজেকে কম্পেয়ার করে বিচার করা সম্ভব। যদি এই পৃথিবীতে শুধুমাত্র একজন মানুষ বেঁচে থাকত তাহলে সুন্দর কথাটা কোন মানেই থাকতো না।

Advertisement

এই যে হীনমন্যতা কিছুটা অন্যরা আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, কিন্তু বেশিরভাগটা আমরা নিজেরা নিজের মধ্যে তৈরি করি। বেশিভাগ অংশটায় কাল্পনিক এবং বাস্তব তাই যে অংশটা কাল্পনিক সেটাকে সিম্প্লে ইগনোর করুন। এবং সবার মধ্যে থেকেও যেটুকু আপনার চোখে সত্যি প্রয়োজনীয় তার মধ্যে থেকেও যে জিনিসগুলো আপনি সত্যিই প্রয়োজন। তা নিয়ে কাজ করুন। যেগুলোতে অন্যদের থেকে পিছিয়ে এবং যেগুলোতে আপনার উন্নতি করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন। শুধুমাত্র সেই গুলোতেই নিজেকে আরও উন্নত করে তোলার জন্য সেই দিকগুলোতে নিজেকে ভালো করে তোলার চেষ্টা করতে শুরু করুন।

আপনি জানেন উসেন্ট ভোল্ট আপনার থেকে জোরে দৌড়ায় তাই বলে কি আপনি হীনমন্যতায় ভোগেন! না। কারন তাতে আপনার কিছু যায় আসে না। তাই দিনের শেষে আপনি সেই সব দিক থেকেই হীনমন্যতায় ভুগতে পারেন যে জিনিস গুলো কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেন। এজন্য আপনি একটু বুঝেশুনে করতে ক্ষতি কোথায়? যখন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন আমরা সবাই জিনিয়াস। কিন্তু কেউ যদি একটা মাছকে গাছে চড়তে পড়ার দক্ষতা অনুযায়ী বিচার করে তাহলে সেটা সারাজীবন হীনমন্যতায় ভুগে কাটাবে। সবশেষে আপনার কাছে একটা ছোট্ট অনুরোধ এই লেখাটা যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে অবশ্যই লেখাটাকে এখনি আপনার প্রিয় জন এবং বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে শেয়ার করুন। কারণ এই লেখাটা যতগুলো শেয়ার হবে আমি বুঝবো ততজনকে আমি একটু হলেও সাহায্য করতে পেরেছি।

Advertisement

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top